চট্টগ্রাম শহরের শান্তি–শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তার স্বার্থে একটি তালিকা প্রকাশ করে দুষ্কৃতকারীদের অবস্থান ও প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এই তালিকায় পেশাদার অপরাধী ও পুলিশের তালিকায় থাকা সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মেয়র এবং ইসকনের চিন্ময় কৃষ্ণের নামও উল্লেখ করা হয়। সেইসাথে বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীর নাম তালিকায় সংযুক্ত হয়। এরমধ্যে এক বিএনপি নেতার নাম বাদ দিয়ে পুনরায় তালিকা প্রকাশ করা হলেও রয়ে গেছে অনেকের নাম। এমন পরিস্থিতিতে তালিকায় বিএনপির নেতাকর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) নগর বিএনপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, এই তালিকায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তালিকায় মৃত ব্যক্তির নামও অন্তর্ভুক্ত আছে। পাশাপাশি, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য গত ১৭ বছর ধরে যারা আন্দোলন ও সংগ্রামে নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে গঠিত গায়েবি মামলার তালিকার নামকে দুষ্কৃতকারীর তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, মহানগর বিএনপির যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃবৃন্দ এই তালিকা দেখে গভীরভাবে বিস্মিত হয়েছেন। তারা সিএমপির এ কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী ও অস্ত্রধারীদের নামেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
তারা বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি জোরদারভাবে উল্লেখ করছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের হেনস্থা করা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের সংবিধান ও আইনকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করা সম্পূর্ণ অনুচিত। আমরা দৃঢ়ভাবে দাবি জানাই, প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্তকরণের মাধ্যমে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের প্রতি কোনো অন্যায় ও অব্যবস্থাপনা না ঘটে।
এর আগে, গতকাল শনিবার ৩৩০ জন দুষ্কৃতকারীর তালিকা প্রকাশ করে সিএমপি। গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দুষ্কৃতকারীদের তালিকাটি প্রথমে পাঠানো হয় বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে। দুষ্কৃতকারীদের এ তালিকায় ৪ নম্বরে ছিল নগর বিএনপি যুগ্ম আহ্বায়ক শওকত আজমের নাম। তবে দিবাগত রাত ১২টা ২৪ মিনিটে তালিকাটি সংশোধন করে পুনরায় পাঠায় নগর পুলিশ। এতে শওকত আজমের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তালিকায় নাম রয়েছে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী ও সাইফুল আলমের। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলরদের মধ্যে গাজী শফিউল আজিম, শৈবাল দাশ , সাহেদ ইকবাল, জহরুল আলম জসিম, মোহাম্মদ হোসেন হিরণ, নাজমুল হক, হাসান মুরাদ, গিয়াস উদ্দিন, নূর মুস্তাফা, আবুল হাসনাত বেলাল, মোবারক হোসেনের নাম রয়েছে।
‘দুষ্কৃতকারীর’ এ তালিকায় সন্ত্রাসীদের মধ্যে রয়েছেন বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী, তার সহযোগী সাজাদ হোসেন, মোবারক হোসেন, মোহাম্মদ রায়হান, খোরশেদ, সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্না শারমিন; ইসমাইল হোসেন, শহিদুল ইসলাম বুইস্যা, নুরুল আলম উরফে হামকা আলম।
সংশোধিত তালিকায় শওকত আজমের নাম বাদ গেলেও বাকলিয়া থানা এলাকার মোর্শেদ খান, কোতোয়ালির হাসান, পাহাড়তলীর মাসুমসহ নগর বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের যুক্ত বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীর নাম রয়েছে। বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, তাদের দলের কয়েকজনকে তালিকায় রাখা হলেও অনেক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রকাশ্য অস্ত্রধারী ও নগরের অনেক চিহ্নিত সন্ত্রাসীর নাম তালিকায় উঠে আসেনি।
তালিকায় বিএনপি নেতার নাম থাকা এবং পরে তা সংশোধনের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদের গণমাধ্যমকে বলেন, ভুলবশত ওই বিএনপি নেতার নাম উঠে গেছে। এ ছাড়া প্রয়াত এক সাবেক কাউন্সিলরের নামও তালিকায় রয়েছে। সেটিও বাদ দেওয়া হচ্ছে।
তালিকায় সন্ত্রাসীদের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নামের বিষয়ে সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, সিআরপিসি অনুযায়ী আমি কোন দল চিনি না। সন্ত্রাসী চিনি… যাদের নাম এসেছে তারা পুলিশের চোখে ‘লিস্টেড ক্রিমিনাল’। এদের মধ্যে যারা কারাগারে আছেন, আছেন। যারা বাইরে আছেন, তারা দুই বছরের জন্য চট্টগ্রাম থেকে বহিষ্কার।