শিল্পখাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদা বৃদ্ধি এবং চলতি বছরে আরও বেশি আমদানির পরিকল্পনার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ১০৯টি এলএনজি-বোঝাই কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এর আগের বছর ২০২৪ সালে ৮৬টি কার্গো আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৩ হাজার ২২ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-এর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্ধিত চাহিদা মেটাতে ২০২৪ সালের তুলনায় সদ্যসমাপ্ত বছরে এলএনজি আমদানিতে আমরা অতিরিক্ত ৮৫৫.৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছি।’
তিনি বলেন, ৩৫ কোটি ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪০ এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজি আমদানিতে মোট ৩ হাজার ৮৭৭ দশমিক ৭৪ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)-এর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের প্রাপ্যতা অপর্যাপ্ত হওয়ায় এলএনজি আমদানি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।’
বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবার এলএনজি আমদানি শুরু করে, কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রথম চালান আসে সে বছরই।
পেট্রোবাংলার পরিচালক একেএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমরা দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও নিয়মিত এলএনজি আমদানি করছি।’
তিনি বলেন, গত বছর আমদানিকৃত এলএনজিও দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি ও স্পট মার্কেটের আওতায় সংগ্রহ করা হয়েছে।
এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সরকার ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেটের মাধ্যমে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল।
আরপিজিসিএল কর্মকর্তারা বলেন, প্রতিটি এলএনজি-বোঝাই কার্গোতে গড়ে প্রায় ৩৩ দশমিক ৬০ লাখ এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ৯ দশমিক ৫ ডলার।
এলএনজি পুনরূপান্তর ও সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে আরপিজিসিএল।
পেট্রোবাংলার উপ-মহাব্যবস্থাপক ও মুখপাত্র তারিকুল ইসলাম খান বলেন, দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে প্রতি মাসেই বাংলাদেশ এলএনজি কার্গো গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি সকাল ৮টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা পর্যন্ত এলএনজি-সহ দেশের মোট ২৪ ঘণ্টার গ্যাস উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৫৯৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন (এমএমসিএফডি), যেখানে চাহিদা ছিল ৩ হাজার ৮শ এমএমসিএফডি।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা বেড়ে ৬ হাজার ২৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।
২০২৫ সালে কাতারএনার্জি প্রায় ১ হাজার ২০৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে এবং ১২ কোটি ৭৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৫৯ এমএমবিটিইউ এলএনজি সম্বলিত ৪০টি কার্গো সরবরাহ করেছে। একই সময়ে ওমানের ওকিউ ট্রেডিং (ওকিউটি) দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ১৬টি কার্গোর বিপরীতে ৫ কোটি ১০ লাখ ১৪ হাজার ৮৮৪ এমএমবিটিইউ এলএনজি সরবরাহ করে প্রায় ৪৪ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, ওকিউটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরও পাঁচটি কার্গো সরবরাহ করেছে, যাতে ছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯৭২ এমএমবিটিইউ এলএনজি। পাশাপাশি সরকার স্পট মার্কেট থেকে ১৫ কোটি ৬৩ লাখ ৬৪ হাজার ২২৫ এমএমবিটিইউ এলএনজি সম্বলিত ৪৮টি কার্গো কিনেছে।
তারা বলেন, পেট্রোচায়না ইন্টারন্যাশনাল, টোটালএনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার ও এম/এস পস্কো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনসহ বিভিন্ন জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে স্পট মার্কেটের মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সেলারেট এনার্জির সঙ্গে এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশ একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে।
তারা বলেন, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গড় এলএনজি মূল্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৮ দশমিক ৪৩ ডলারে উঠে যায়, যা ২০২৪ সালে নেমে আসে ১২ দশমিক ৮৪ ডলারে, ২০২৫ সালের জুনে ছিল ১৩ দশমিক ৫২ ডলার এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ২ ডলারে।
ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান ২০২৩ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের গ্যাস চাহিদা দৈনিক ৬ হাজার ২৪০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি) পৌঁছবে। এ মাস্টার প্ল্যানে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি খাতের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৩ সালের শেষ নাগাদ আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর পরিচালিত ক্ষেত্রসহ সব গ্যাসক্ষেত্র থেকে দেশের মোট গ্যাস উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ২ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ঘনফুট, যা ২০১২ সালের গড় উৎপাদন প্রায় ২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ঘনফুটের তুলনায় কম।